বিজ্ঞান, ছদ্মবিজ্ঞান এবং অপবিজ্ঞান

আমাদের যাপিত জীবন যাপন করার পদ্ধতি হচ্ছে বিজ্ঞানের তত্ত্ব তথ্য আর প্রয়োগিকতার  সর্বোৎকৃষ্ট   রূপ ব্যবহার করে ছদ্মবিজ্ঞানকে আশ্রয় করে অপবিজ্ঞানের মাঝে বাস করা। অপবিজ্ঞান আর ছদ্মবিজ্ঞানের জাঁকজমকে প্রকৃত বিজ্ঞান হয়ে পরে ম্লান। মিডিয়া আর মিডিয়া সংক্রান্ত অর্থনৈতিক মাধ্যম গুলোর বহুল প্রচারণা মূলত এদের পেছনে কাজ করে। সে অর্থনৈতিক বিষয়টা থাক আমরা বরং বিজ্ঞান অপবিজ্ঞান আর ছদ্মবিজ্ঞান সম্পর্কে একটু আধটু ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করি।

সাদামাটা কথায় বিজ্ঞান বলতে যেটা বুঝায় সেটা হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম নীতি কায়দা কানুন বের করা সাথে যৌক্তিক উপায়ে বাস্তবতা নির্ধারণ করে ব্যাখ্যা করা। অর্থাৎ বিজ্ঞান শব্দটিকে বিশেষ জ্ঞান যে রকম বলা যায় তেমনি আরেকটু ভালো ভাবে বলা যায় বিশ্লেষিত জ্ঞান।

যৌক্তিক উপায়’টি হচ্ছে কিন্তু সম্পূর্ণ পরীক্ষা নিরীক্ষা নির্ভর যেখানে আবেগি অনুমান বা বিশ্বাসের অনুকল্পের কোন স্থান নেই। যেমন আমাদের দৈনন্দিন সাধারণ পরিবেশের কথা ধরা যাক। কোথাও আগুন থাকলে সেখানে আমরা ধোঁয়া দেখি। সেটা আমরা হাজার ফার্নিচার পুরিয়ে ছারখার করে ফেলে পরীক্ষা করলেও সেই নিরীক্ষণে ধোঁয়াই পাবো।  এই পরীক্ষার পর নিরীক্ষণ করাটা হচ্ছে যৌক্তিক উপায়। এথেকে আমরা যে সিদ্ধান্ত পাই সেটা হচ্ছে, ধোঁয়া আর আগুন পরস্পর সম্পর্কিত। একটা থাকলে আরেকটাও থাকবে। এই সিদ্ধান্ত হচ্ছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সত্যায়িত করে পাওয়া একটি তথ্য। অন্য কথায় বাস্তবতা।  এখন আমরা কোথাও ধোঁয়া দেখলে বুঝবো সেখানে কোন না কোন ভাবে আগুন সম্পর্কিত কোন ব্যাপার আছে। কোন কিছু পুড়ছে বিধায় আগুন জ্বলছে। দূরে থাকলে সেই পুরতে থাকা ‘কোন কিছু’টাকে নাও দেখতে পারি, তবুও বলতে পারছি সেখানে আগুন ঠিকই আছে। এটা বলছি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে।

কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে সেটা নেভানোর চেষ্টা করে। সে জন্য দূরে আগুন দেখলেই কিন্তু বলতে পারিনা দমকলের বাহিনী এসে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। তবে তা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। এটা হচ্ছে এক ধরনের অনুমিত ব্যাপার। একে বাস্তবতা বলতে পারব না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা গিয়ে দেখে নিশ্চিত হচ্ছি। এই নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টা হল বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ।  যেখানে সরাসরি না বিশ্লেষণ করে কোন কিছু গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়।

এতক্ষণ মূলত হালকা ভাবে  বৈজ্ঞানিক কাজের ধরন আর বাস্তবতা নিয়ে কথাবার্তা বলা হল। এবার অপবিজ্ঞান আর ছদ্মবিজ্ঞান নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

তো আগে অপবিজ্ঞান। অপবিজ্ঞানটা কি? বৈজ্ঞানিক তথ্য গুলোকে যুক্তি ছারা অমূলক ব্যাখ্যা দেয়াকে অপবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। এর প্রধান কাজ হচ্ছে অমূলক ধ্যান ধারনাকে বিজ্ঞানের নামে চালিয়ে দেয়া। উদাহরণে উল্লেখ করা যেতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা। সে সময় জার্মান খ্রিস্টানরা দাবি করে বসলো বিবর্তনের ধাপে জেনেটিকালি  ওরাই সব চাইতে উন্নত। অন্যরা নিচু জাতের, নিকৃষ্ট। এটা ছিল অন্য ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করার একটা উগ্র নগ্ন যুক্তি। এ হল বিবর্তন আর জেনেটিক্সের বাস্তবতার এক ধরনের অপ ব্যাখ্যা। অন্য কথায় অপবিজ্ঞান।

সমাজে সবচাইতে বহুল প্রচলিত অপবিজ্ঞান গুলর মধ্যে উল্লেখ করার মত হল- অ্যাসট্রোলজি বা জ্যোতিষ শাস্ত্র, নিউমেরলজি বা সংখ্যা শাস্ত্র আর ভূত প্রেতের মত অলীক সব বিষয় আসয় যেমন তেমনি ইউএফও আর এলিয়েন সংক্রান্ত ধোঁয়াশা সমূহ। এদের নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে বলা যায় জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে। অতীতের কোন সময়ে হয়তো যে বছর সূর্য গ্রহণ হয়ে ছিল সে বছরে বা তার কিছু পর কোন মহামারির প্রাদুর্ভাব হয়েছিল নয়তো মারা গিয়ে ছিল রাজা অথবা শত্রুর দ্বারা হয়েছিল আক্রান্ত। কোন একজন কোথাও টুকে রাখল ‘উমুক দিনের গ্রহণের পরে তুমুক সময়ে ওই ঘটনাটি ঘটিয়াছে’।  তার মানে কিন্তু নয় প্রতি সূর্য গ্রহণের পর এধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। তবে বিশৃঙ্খল দুনিয়ার ঘটনা প্রবাহে দু আধটা মিল পাওয়া গেলেও যেতে পারে। সেটা বাস্তবতা নয়। এ শাস্ত্রটি সম্পূর্ণটাই এই কনসেপ্ট এটার উপরেই ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এ অনুযায়ী আকাশী বস্তুদের উমুক অবস্থার জন্য তুমুক ঘটনা বলে ভবিষ্যৎ বানী করাই এর কাজ।

নিউমেরলজি বা সংখ্যা শাস্ত্র হল আরেকটি মজার বিষয়। মজা করার জন্য চমৎকার কিন্তু বিশ্বাস করলেই সমস্যা কারণ এ যে অবাস্তব। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় ফেলতে চাইলে হবে অপবিজ্ঞান। নিউমেরলজি আসলে বিভিন্ন ধরনের গাণিতিক অপারেশনের খেলা। গাণিতিক অপারেশন বলতে বুঝায় যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ এর মত বিষয়গুলোকে। কোন একটি অথবা একাধিক বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যকার বিভিন্ন উপাত্ত নিয়ে এ অপারেশন গুলোর মাধ্যমে নিউমেরিক্যাল বা সাংখ্যিক সমতা আনা হল এর প্রধান কাজ।

এতে যেমন কিছু নিউমেরিক্যাল উপাত্ত গণায় ধরা হয় তেমনি বাদ দেয়া হয় অসংখ্য উপাত্তের সাংখ্যিক বা অপারেশনাল ভেলুকে। কারণ এর কাজ শুধু সিমিলারিটি বা সমতা বের করা যায় এমন কিছু গ্রহণ করে বাকি সব কিছুকে বাদ দেয়া।  এ সাদৃশ্যটা বের করা কিন্তু মজার তবে এ সাদৃশ্যতা দেখিয়ে কোন কিছুকে অতিলৌকিক বলে দাবি করে বসে থাকলে সেটা পরবে অপবিজ্ঞানের কাতারে।  যদিও অনেক সময়েই দেখা যায় বিভিন্ন বই পুস্তক আর বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে এ ধরনের আবেশে আবেশিত করে রঙে রং চঙ্গিয়ে আমাদের সামনে হাজির করা হয় অলৌকিক বলে।

যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া নাইন ইলিভেনের শতাব্দীর অন্যতম ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাসী হামলার নিউমেরলজি। নিউমেরলজিতে ৯-১১ কে দেখানো হয়েছে ৯+১+১=১১, ১১ই সেপ্টেম্বর বছরের ২৫৪তম দিন যেখানে দেখানো যায় ২+৫+৪=১১। আক্রান্ত এলাকার নাম (New York City, Pentagon) আর হামলায় জড়িত থাকা সন্ত্রাসীদের বহুল প্রচলিত এলাকার নাম (Afghanistan) এদের প্রত্যেকটিতে রয়েছে ১১তি করে অক্ষর। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। তার মানে এই নয় ৯ আর ১১ এর খেল দেখেই সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছিল। অথবা ঘটনাটি অতিলৌকিক। মোটেই সেটা কিন্তু নয়। এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ কয়েকটি অপারেশন নেয়া হয়েছে। আর যেসব অপারেশন-কম্বিনেশন এধরনের ফলাফল দেখায় না দেয়া হয়েছে বাদ সে গুলোকে।

আমাদের মানুষের চারিত্রিক একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমারা যেভাবেই হোক সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে চাই। যেগুলো স্বাভাবিক ভাবে করা যায় সেতো যায়ই। যেগুলোকে করা যায় না সেগুলোকেও ব্যাখ্যা করতে আমরা আশ্রয় নিয়ে ফেলি কল্পনার। প্রাচীন পৃথিবীতে চরে বেড়ানো এলিয়েন আর তাদের আকাশ যানদের ধারণা গুলো কিন্তু ওরকম কল্পনারই ফসল। এগুলো তৈরি হয়েছে ব্যাখ্যার নিমিত্তে।  যেমন পাঁচ হাজার বছর আগেকার প্রাচীন মিশরীয় পিরামিড। অত্যাধুনিক কোন কারিগরি সহায়তা ছাড়া যে ধরনের এগুলো তৈরি সেটা কিন্তু এখনও এক বিস্ময়। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে আমারা অনেকটাই আঁচ করতে পারি ওদের কর্ম পদ্ধতি  তারপরেও আমারা তাদের ব্যবহৃত প্রকৃত পদ্ধতি গুলো ঠিক ঠিক ভাবে জানি না। কারণ নির্মাণ কাজে যুক্ত সকল নথি নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল, মেরে ফেলা হয়েছিল নির্মাণ কাজে সম্পৃক্ত সবাইকে। যেন কেও ওরকম কিছু আর না বানাতে পারে। সে জন্য কল্পনায় এলিয়েন সম্প্রদায় এনে বসিয়ে তাদের অত্যাধুনিক মেশিনারি দিয়ে তো আর এই নিদর্শন গুলো বানিয়ে নিতে পারি না। আর সে ধরনের প্রচারণার কোন যৌক্তিকতাও নেই।  বর্তমান সময়েও অন্যমনস্কতার দরুন দেখা বা যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দেখা কোন কিছু বা অজানা পরীক্ষাধীন কোন যান দেখে এলিয়েন যান ভেবে বসাটাও অপবিজ্ঞান। এক কথায় কল্পনা বিলাস।

আরও কত শত অপবিজ্ঞান যে আমাদের ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার কোন আদি অন্ত নেই। ইস্টার দ্বীপের মূর্তি নয়তো প্রাচীন ভারতীয় এলিয়েন দেব-দেবী অথবা বারমুডা ট্রাইয়েঙ্গেলের নিছক কয়েকটি দুর্ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাঙিয়ে নিয়ে গড়া কত কিছু নিয়ে কত কাহিনী। এরা সবাই অপবিজ্ঞানের ক্যাটাগরিতে পরে।

আর আমাদের উপর তো ছদ্মবিজ্ঞান প্রভাব আরো চমৎকার, অসম্ভব বিষয় আসয় এরা খুব সহজেই আমাদের বিশ্বাস করিয়ে ফেলে। নিছক কোন কথা, লিখা, বক্তব্য বা মন্তব্য কে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য বের করে ফেলা হচ্ছে ছদ্মবিজ্ঞানের কাজ। প্রাচীন পুথি, পুরাণ প্রচলিত গল্পে বৈজ্ঞানিক নিদর্শন বেরকরে ফেলে বিজ্ঞানের আলোকে অবিজ্ঞানকে মুড়ে অলৌকিক বিজ্ঞান বলে চালান দেয় এই ছন্দবিজ্ঞান। কোন কিছু হয়তো লিখা হয়েছিল নিছক কাব্যিকতা করে, হয়তো মনোরঞ্জনের জন্যে । তাই বলে লাইনে লাইনে পাতায় পাতায় আগে খুঁজে না পেয়ে এখন নতুন কিছু আবিষ্কারের পর, উদ্ভাবনের পর তাদের কথা পরতে পরতে খুঁজে পাওয়া সে তো ছন্দবিজ্ঞানের ছান্দিক এক নিদর্শন। অতঃপর, দাবী করে বসা- আরে এ জিনিসটা! এটা-তো শত, সহস্র বছর আগেই উমুকের তুমুক লেখায় নয়তো তুমুক পুথিতে লিখা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে পৌরাণিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আণবিক অস্ত্রের ইঙ্গিত, ধর্মীয় পুস্তকের ধোঁয়াশাময় মন্তব্যের মাঝে আবিষ্কারের আগে না পেয়ে এখন আবিষ্কার করে বসা বিজ্ঞানকে, মধ্য যুগের নস্তাডামুসের হেঁয়ালিতে ভরা অলস ছান্দিক ছড়ায় বর্তমান সময়ের সাবমেরিন রেডিও যোগাযোগ সহ হরেক কিছুর ‘স্পষ্ট’ নিদর্শন খুঁজে পাওয়া। তারপর দাবী উত্থাপন করে প্রচার করা এদের আজব অলৌকিকতার কথা। তাই জ্ঞান বিজ্ঞানের অলিতে গলিতে ধর্না না দিয়ে এদের নিয়ে পরে থাকলেই হয়। সেটাই তো স্বাভাবিক হওয়া উচিৎ! এভাবেই বিজ্ঞান দিয়েই তৈরি করা হয় বিজ্ঞান বিমুখীতা সবার মাঝে কখনো আশ্রয় করে অপবিজ্ঞানকে, কখনো আশ্রয় করে ছদ্মবিজ্ঞানকে ।

যারা প্রকৃত বিজ্ঞান জানতে বুঝতে চায় তাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত খাবার পানি হলেই খেতে হবে এমন কোন কথা নেই। কারণ কোন ময়লা আবর্জনা যে সেখানে নেই তেমন কোন কথাও নেই। পান করতে হবে ফিল্টারিং করে অর্থাৎ ছেঁচে কেঁচে যে বিশুদ্ধ অংশটুকু থাকে তাকে। তেমনি বিজ্ঞান হিসেবে যা চলছে বা চালানো হচ্ছে তাকে বিজ্ঞান হিসেবে জানার কোন মানে নেই ফিল্টারিং করে অপবিজ্ঞান, ছদ্মবিজ্ঞানের মত অলীক অংশ গুলোকে বাদ দিয়ে প্রকৃত অংশটা খুঁজে পেতে ওটাকে গ্রহণ করার চেষ্টা আমাদের দর্শনের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

আমাদের যাপিত জীবন যাপন করার পদ্ধতি হচ্ছে বিজ্ঞানের তত্ত্ব তথ্য আর প্রয়োগিকতার  সর্বোৎকৃষ্ট   রূপ ব্যবহার করে ছন্দ বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে অপবিজ্ঞানের মাঝে বাস করা। অপবিজ্ঞান আর ছদ্মবিজ্ঞানের জাঁকজমকে প্রকৃত বিজ্ঞান হয়ে পরে ম্লান। মিডিয়া আর মিডিয়া সংক্রান্ত অর্থনৈতিক মাধ্যম গুলোর বহুল প্রচারণা মূলত এদের পেছনে কাজ করে। সে অর্থনৈতিক বিষয়টা থাক আমরা বরং বিজ্ঞান অপবিজ্ঞান আর ছন্দবিজ্ঞান সম্পর্কে একটু আধটু ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করি।

সাদামাটা কথায় বিজ্ঞান বলতে যেটা বুঝায় সেটা হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম নীতি কায়দা কানুন বের করা সাথে যৌক্তিক উপায়ে বাস্তবতা নির্ধারণ করে ব্যাখ্যা করা। অর্থাৎ বিজ্ঞান শব্দটিকে বিশেষ জ্ঞান যে রকম বলা যায় তেমনি আরেকটু ভালো ভাবে বলা যায় বিশ্লেষিত জ্ঞান।

যৌক্তিক উপায়’টি হচ্ছে কিন্তু সম্পূর্ণ পরীক্ষা নিরীক্ষা নির্ভর যেখানে আবেগি অনুমান বা বিশ্বাসের অনুকল্পের কোন স্থান নেই। যেমন আমাদের দৈনন্দিন সাধারণ পরিবেশের কথা ধরা যাক। কোথাও আগুন থাকলে সেখানে আমরা ধোঁয়া দেখি। সেটা আমরা হাজার ফার্নিচার পুরিয়ে ছারখার করে ফেলে পরীক্ষা করলেও সেই নিরীক্ষণে ধোঁয়াই পাবো।  এই পরীক্ষার পর নিরীক্ষণ করাটা হচ্ছে যৌক্তিক উপায়। এথেকে আমরা যে সিদ্ধান্ত পাই সেটা হচ্ছে, ধোঁয়া আর আগুন পরস্পর সম্পর্কিত। একটা থাকলে আরেকটাও থাকবে। এই সিদ্ধান্ত হচ্ছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সত্যায়িত করে পাওয়া একটি তথ্য। অন্য কথায় বাস্তবতা।  এখন আমরা কোথাও ধোঁয়া দেখলে বুঝবো সেখানে কোন না কোন ভাবে আগুন সম্পর্কিত কোন ব্যাপার আছে। কোন কিছু পুড়ছে বিধায় আগুন জ্বলছে। দূরে থাকলে সেই পুরতে থাকা ‘কোন কিছু’টাকে নাও দেখতে পারি, তবুও বলতে পারছি সেখানে আগুন ঠিকই আছে। এটা বলছি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে।

কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে সেটা নেভানোর চেষ্টা করে। সে জন্য দূরে আগুন দেখলেই কিন্তু বলতে পারিনা দমকলের বাহিনী এসে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। তবে তা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। এটা হচ্ছে এক ধরনের অনুমিত ব্যাপার। একে বাস্তবতা বলতে পারব না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা গিয়ে দেখে নিশ্চিত হচ্ছি। এই নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টা হল বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ।  যেখানে সরাসরি না বিশ্লেষণ করে কোন কিছু গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়।

এতক্ষণ মূলত হালকা ভাবে  বৈজ্ঞানিক কাজের ধরন আর বাস্তবতা নিয়ে কথাবার্তা বলা হল। এবার অপবিজ্ঞান আর ছদ্মবিজ্ঞান নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

তো আগে অপবিজ্ঞান। অপবিজ্ঞানটা কি? বৈজ্ঞানিক তথ্য গুলোকে যুক্তি ছারা অমূলক ব্যাখ্যা দেয়াকে অপবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। এর প্রধান কাজ হচ্ছে অমূলক ধ্যান ধারনাকে বিজ্ঞানের নামে চালিয়ে দেয়া। উদাহরণে উল্লেখ করা যেতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা। সে সময় জার্মান খ্রিস্টানরা দাবি করে বসলো বিবর্তনের ধাপে জেনেটিকালি  ওরাই সব চাইতে উন্নত। অন্যরা নিচু জাতের, নিকৃষ্ট। এটা ছিল অন্য ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করার একটা উগ্র নগ্ন যুক্তি। এ হল বিবর্তন আর জেনেটিক্সের বাস্তবতার এক ধরনের অপ ব্যাখ্যা। অন্য কথায় অপবিজ্ঞান।

সমাজে সবচাইতে বহুল প্রচলিত অপবিজ্ঞান গুলর মধ্যে উল্লেখ করার মত হল- অ্যাসট্রোলজি বা জ্যোতিষ শাস্ত্র, নিউমেরলজি বা সংখ্যা শাস্ত্র আর ভূত প্রেতের মত অলীক সব বিষয় আসয় যেমন তেমনি ইউএফও আর এলিয়েন সংক্রান্ত ধোঁয়াশা সমূহ। এদের নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে বলা যায় জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে। অতীতের কোন সময়ে হয়তো যে বছর সূর্য গ্রহণ হয়ে ছিল সে বছরে বা তার কিছু পর কোন মহামারির প্রাদুর্ভাব হয়েছিল নয়তো মারা গিয়ে ছিল রাজা অথবা শত্রুর দ্বারা হয়েছিল আক্রান্ত। কোন একজন কোথাও টুকে রাখল ‘উমুক দিনের গ্রহণের পরে তুমুক সময়ে ওই ঘটনাটি ঘটিয়াছে’।  তার মানে কিন্তু নয় প্রতি সূর্য গ্রহণের পর এধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। তবে বিশৃঙ্খল দুনিয়ার ঘটনা প্রবাহে দু আধটা মিল পাওয়া গেলেও যেতে পারে। সেটা বাস্তবতা নয়। এ শাস্ত্রটি সম্পূর্ণটাই এই কনসেপ্ট এটার উপরেই ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এ অনুযায়ী আকাশী বস্তুদের উমুক অবস্থার জন্য তুমুক ঘটনা বলে ভবিষ্যৎ বানী করাই এর কাজ।

নিউমেরলজি বা সংখ্যা শাস্ত্র হল আরেকটি মজার বিষয়। মজা করার জন্য চমৎকার কিন্তু বিশ্বাস করলেই সমস্যা কারণ এ যে অবাস্তব। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় ফেলতে চাইলে হবে অপবিজ্ঞান। নিউমেরলজি আসলে বিভিন্ন ধরনের গাণিতিক অপারেশনের খেলা। গাণিতিক অপারেশন বলতে বুঝায় যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ এর মত বিষয়গুলোকে। কোন একটি অথবা একাধিক বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যকার বিভিন্ন উপাত্ত নিয়ে এ অপারেশন গুলোর মাধ্যমে নিউমেরিক্যাল বা সাংখ্যিক সমতা আনা হল এর প্রধান কাজ।

এতে যেমন কিছু নিউমেরিক্যাল উপাত্ত গণায় ধরা হয় তেমনি বাদ দেয়া হয় অসংখ্য উপাত্তের সাংখ্যিক বা অপারেশনাল ভেলুকে। কারণ এর কাজ শুধু সিমিলারিটি বা সমতা বের করা যায় এমন কিছু গ্রহণ করে বাকি সব কিছুকে বাদ দেয়া।  এ সাদৃশ্যটা বের করা কিন্তু মজার তবে এ সাদৃশ্যতা দেখিয়ে কোন কিছুকে অতিলৌকিক বলে দাবি করে বসে থাকলে সেটা পরবে অপবিজ্ঞানের কাতারে।  যদিও অনেক সময়েই দেখা যায় বিভিন্ন বই পুস্তক আর বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে এ ধরনের আবেশে আবেশিত করে রঙে রং চঙ্গিয়ে আমাদের সামনে হাজির করা হয় অলৌকিক বলে।

যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া নাইন ইলিভেনের শতাব্দীর অন্যতম ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাসী হামলার নিউমেরলজি। নিউমেরলজিতে ৯-১১ কে দেখানো হয়েছে ৯+১+১=১১, ১১ই সেপ্টেম্বর বছরের ২৫৪তম দিন যেখানে দেখানো যায় ২+৫+৪=১১। আক্রান্ত এলাকার নাম (New York City, Pentagon) আর হামলায় জড়িত থাকা সন্ত্রাসীদের বহুল প্রচলিত এলাকার নাম (Afghanistan) এদের প্রত্যেকটিতে রয়েছে ১১তি করে অক্ষর। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। তার মানে এই নয় ৯ আর ১১ এর খেল দেখেই সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছিল। অথবা ঘটনাটি অতিলৌকিক। মোটেই সেটা কিন্তু নয়। এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ কয়েকটি অপারেশন নেয়া হয়েছে। আর যেসব অপারেশন-কম্বিনেশন এধরনের ফলাফল দেখায় না দেয়া হয়েছে বাদ সে গুলোকে।

আমাদের মানুষের চারিত্রিক একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমারা যেভাবেই হোক সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে চাই। যেগুলো স্বাভাবিক ভাবে করা যায় সেতো যায়ই। যেগুলোকে করা যায় না সেগুলোকেও ব্যাখ্যা করতে আমরা আশ্রয় নিয়ে ফেলি কল্পনার। প্রাচীন পৃথিবীতে চরে বেড়ানো এলিয়েন আর তাদের আকাশ যানদের ধারণা গুলো কিন্তু ওরকম কল্পনারই ফসল। এগুলো তৈরি হয়েছে ব্যাখ্যার নিমিত্তে।  যেমন পাঁচ হাজার বছর আগেকার প্রাচীন মিশরীয় পিরামিড। অত্যাধুনিক কোন কারিগরি সহায়তা ছাড়া যে ধরনের এগুলো তৈরি সেটা কিন্তু এখনও এক বিস্ময়। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে আমারা অনেকটাই আঁচ করতে পারি ওদের কর্ম পদ্ধতি  তারপরেও আমারা তাদের ব্যবহৃত প্রকৃত পদ্ধতি গুলো ঠিক ঠিক ভাবে জানি না। কারণ নির্মাণ কাজে যুক্ত সকল নথি নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল, মেরে ফেলা হয়েছিল নির্মাণ কাজে সম্পৃক্ত সবাইকে। যেন কেও ওরকম কিছু আর না বানাতে পারে। সে জন্য কল্পনায় এলিয়েন সম্প্রদায় এনে বসিয়ে তাদের অত্যাধুনিক মেশিনারি দিয়ে তো আর এই নিদর্শন গুলো বানিয়ে নিতে পারি না। আর সে ধরনের প্রচারণার কোন যৌক্তিকতাও নেই।  বর্তমান সময়েও অন্যমনস্কতার দরুন দেখা বা যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দেখা কোন কিছু বা অজানা পরীক্ষাধীন কোন যান দেখে এলিয়েন যান ভেবে বসাটাও অপবিজ্ঞান। এক কথায় কল্পনা বিলাস।

আরও কত শত অপবিজ্ঞান যে আমাদের ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার কোন আদি অন্ত নেই। ইস্টার দ্বীপের মূর্তি নয়তো প্রাচীন ভারতীয় এলিয়েন দেব-দেবী অথবা বারমুডা ট্রাইয়েঙ্গেলের নিছক কয়েকটি দুর্ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাঙিয়ে নিয়ে গড়া কত কিছু নিয়ে কত কাহিনী। এরা সবাই অপবিজ্ঞানের ক্যাটাগরিতে পরে।

আর আমাদের উপর তো ছদ্মবিজ্ঞান প্রভাব আরো চমৎকার, অসম্ভব বিষয় আসয় এরা খুব সহজেই আমাদের বিশ্বাস করিয়ে ফেলে। নিছক কোন কথা, লিখা, বক্তব্য বা মন্তব্য কে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য বের করে ফেলা হচ্ছে ছদ্মবিজ্ঞানের কাজ। প্রাচীন পুথি, পুরাণ প্রচলিত গল্পে বৈজ্ঞানিক নিদর্শন বেরকরে ফেলে বিজ্ঞানের আলোকে অবিজ্ঞানকে মুড়ে অলৌকিক বিজ্ঞান বলে চালান দেয় এই ছন্দবিজ্ঞান। কোন কিছু হয়তো লিখা হয়েছিল নিছক কাব্যিকতা করে, হয়তো মনোরঞ্জনের জন্যে । তাই বলে লাইনে লাইনে পাতায় পাতায় আগে খুঁজে না পেয়ে এখন নতুন কিছু আবিষ্কারের পর, উদ্ভাবনের পর তাদের কথা পরতে পরতে খুঁজে পাওয়া সে তো ছন্দবিজ্ঞানের ছান্দিক এক নিদর্শন। অতঃপর, দাবী করে বসা- আরে এ জিনিসটা! এটা-তো শত, সহস্র বছর আগেই উমুকের তুমুক লেখায় নয়তো তুমুক পুথিতে লিখা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে পৌরাণিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আণবিক অস্ত্রের ইঙ্গিত, ধর্মীয় পুস্তকের ধোঁয়াশাময় মন্তব্যের মাঝে আবিষ্কারের আগে না পেয়ে এখন আবিষ্কার করে বসা বিজ্ঞানকে, মধ্য যুগের নস্তাডামুসের হেঁয়ালিতে ভরা অলস ছান্দিক ছড়ায় বর্তমান সময়ের সাবমেরিন রেডিও যোগাযোগ সহ হরেক কিছুর ‘স্পষ্ট’ নিদর্শন খুঁজে পাওয়া। তারপর দাবী উত্থাপন করে প্রচার করা এদের আজব অলৌকিকতার কথা। তাই জ্ঞান বিজ্ঞানের অলিতে গলিতে ধর্না না দিয়ে এদের নিয়ে পরে থাকলেই হয়। সেটাই তো স্বাভাবিক হওয়া উচিৎ! এভাবেই বিজ্ঞান দিয়েই তৈরি করা হয় বিজ্ঞান বিমুখীতা সবার মাঝে কখনো আশ্রয় করে অপবিজ্ঞানকে, কখনো আশ্রয় করে ছদ্মবিজ্ঞানকে ।

যারা প্রকৃত বিজ্ঞান জানতে বুঝতে চায় তাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত খাবার পানি হলেই খেতে হবে এমন কোন কথা নেই। কারণ কোন ময়লা আবর্জনা যে সেখানে নেই তেমন কোন কথাও নেই। পান করতে হবে ফিল্টারিং করে অর্থাৎ ছেঁচে কেঁচে যে বিশুদ্ধ অংশটুকু থাকে তাকে। তেমনি বিজ্ঞান হিসেবে যা চলছে বা চালানো হচ্ছে তাকে বিজ্ঞান হিসেবে জানার কোন মানে নেই ফিল্টারিং করে অপবিজ্ঞান, ছদ্মবিজ্ঞানের মত অলীক অংশ গুলোকে বাদ দিয়ে প্রকৃত অংশটা খুঁজে পেতে ওটাকে গ্রহণ করার চেষ্টা আমাদের দর্শনের প্রথম লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন।

Advertisements

2 thoughts on “বিজ্ঞান, ছদ্মবিজ্ঞান এবং অপবিজ্ঞান

    • It’s about metaphysics, numberology, astrology, and similar meta stuffs. There plenty of articles are available about those topics. So may be not, but I’d try to share something special here. But need some free times to complete those :/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s