অচিন দেয়ালের পাশে

কর্ম সূত্রে আমাকে প্রতিদিনই পাবলিক বাসে করে যাতায়াত করতে হয়। যানজটরে কল্যাণে এই  আসা যাওয়ার সময় এক ঘণ্টার রাস্তা থেকে গিয়ে ঠেকেছে তিন সারে তিন ঘণ্টার রাস্তায়। প্রতিদিন কত শত মানুষ যে দেখছি, কত রকমের কথাবার্তা আলাপ আলোচনা শুনছি তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। এরা প্রত্যেকেই বাস্তব জীবনের একেকটি চরিত্র। তাদের আচার আচরণে কত তফাৎ, চিন্তা ভাবনা মননে একজন থেকে অন্য জনের যে কতটা পার্থক্য সেটি কল্পনা করাও কল্পনার বাইরে। গোটা অখণ্ডিত সমাজের খানিকটা করে অংশ যেন প্রতিদিন প্রতিটি বাসে উঠে পড়ে। যার যার আলাদা পথে দৌড়নোর মাঝে খানিকটা সময়ের জন্যে যেন সবাই একত্রিত হয়ে যায়, হয়ে যায় নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বাসের একছত্র অংশ, প্রত্যেকে আলাদা হওয়ার পরেও খানিকটা পথ যেন সবার চলেতে হয় একসাথে, একই পথের পথিক হয়ে। এগুলো দার্শনিক চিন্তা ভাবনার কথা,আপাতত থাক এ সব । রোজকার রুটিন মোতাবেক সে দিনও পাবলিক বাসে করে বাড়ি ফিরছিলাম। দুই ঘণ্টার মতো পেরিয়ে গেছে। লোকজন দিয়ে পুরো বাস যেন গিজগিজ করছে। পা ফেলার জায়গা নেই। কপাল ভালো আমি সিট পেয়ে ছিলাম, নইলে ওই গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে ফিরতে হত। যদিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞতা আমার ব্যাপক। হবে না কেন, প্রায়ই যে আমাকে দাঁড়িয়েই ফিরতে হয়। মিরপুর রোড দিয়ে গাবতলির দিকে যাবার পথে কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড আসা মাত্রই বরাবরের মতো অধিকাংশ যাত্রী হুট করে যেন নেমে গেল। আগে থেকেই কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম তার উপর বাসের ভীর কমে যাওয়ায় আর শেষ দুপুরের ক্রমে ঠাণ্ডা হয়ে আসা তপ্ত বাতাসে একটু ঝিমুনি ভাব চলে এলো। কতক্ষণ ঝিমিয়েছি জানি না তবে ঝিমুনি ভাবটা উবে গেল গাবতলি পার হবার ঠিক পরেই। দেখলাম বয়স্ক এক ফেরিওয়ালা উঠেছে। পোর খাওয়া চেহারা, মুখে খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা দাঁড়ি, মাথা অনেকটাই টেকো আর চুল যা আছে তা খুবই ছোট করে ছাঁটা আর সবই পাকা। বেশ মোটাসোটা আর শক্তসমর্থ রোদে পোড়া কালো শরীর দেখে বুঝা যায় না প্রকৃত বয়স, তবে অনুমান করলাম ষাট পঁয়ষট্টি হবে হয়তো। বাঁ কাঁধে ঝোলানো কালো একটা ব্যাগ ডান হাতে কয়েকটা চকমকে বই। সবই বাচ্চাদের বই। অ-আ, A-B-C-D শেখার বই। আমি প্রায় শেষের দিকে বসে ছিলাম দেখলাম লোকটা বাসের লেন ধরে এগুচ্ছে আর ডানে বায়ে সিটে বসে থাকা লোকজনদের বই দেখিয়ে দেখিয়ে জিগ্যেস করছে কারো প্রয়োজন আছে কি না। রোজরোজ এমন ফেরিওয়ালা হরহামেশাই দেখা যায়, দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে কারো দিকে তেমন ভালো করে তাকানই হয় না আজকাল। যথারীতি ফেরিওলার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তায় কাজ চলছিল ধুলাবালি ছাড়া কিছু দেখার ছিল না। দৃষ্টি ফিরিয়ে আবার বাসের ভেতরে আনলাম। বাসে শেষ মাথা থেকে চলে যাচ্ছে বাচ্চাদের বই ফেরিওয়ালা, এদিকে আসার সময় লোকটার কাছ থেকে তিন চার জন যাত্রী বই দেখতে নিয়েছিল। ফেরত দিয়ে দিচ্ছিল সবাই। এদের দরকার নেই। সবার সামনে বসা এক হুজুর মতো যাত্রী তার হাতের বইটি ফিরিয়ে দেয়ার সময় জিগ্যেস করতে শুনলাম বলছে, ‘এইটার দাম কত?’

‘ত্রিশ টাকা।’, হঠাৎ বাসের ছোট খাটো একটা ঝাঁকুনিতে উপরের রড ধরে নিজেকে সামলে নিতে নিতে বলল বয়স্ক ফেরিওলা।

‘পনেরো টাকা দিবো’।

‘নাহ, তাইলে দেয়া যাবে না, লাভ থাকে না’। একটু থেমে বলল ‘পঁচিশ টাকায় নিবেন? বইয়ের পৃষ্ঠা গুলা কিন্তু অনেক শক্ত’।

শুনে আমার মনে হল আজকে লোকাটার বেচা বিক্রি ভালো না। কারণ, বইয়ের দোকান গুলতে প্রায়ই ঢু দেই তো তাই জানি, বাজারে এই সব বইয়ের দাম চোখ বন্দ করে চায় চল্লিশ টাকা আর ত্রিশ টাকার নিচে কখনো বিক্রি করে না। সেখানে এ চাচ্ছে পঁচিশ টাকা।

হুজুর লোকটা এবার বলল, ‘পঁচিশ না। ঠিক আছে বিশ টাকা হইলে দেন নইলে লাগবো না’। সঙ্গে আরও বলল, ‘শক্ত পেইজ কইলেই হইলো। পোলাপান বই দুই দিনও রাখে না, ছিঁড়া ফালায়’।

‘তাইলে দেয়া যাবে না, বিশ টাকায় কোন লাভ থাকে না।’ বলে বাস থামিয়ে এক যাত্রী নামছিল তার পেছন পেছন নেমে গেল। যাওয়ার সময় নিজেকেই যেন বলছে শুনলাম ‘পোলাপান ছোটবেলা ছিঁড়ে বই আর বড় হইলে ছিঁড়ে বাপমায়ের কইলজা’।

শেষ কথাটি যেন মনে হল আমাকে প্রচণ্ড এক ধাক্কা দিল। বুঝেতে পারলাম এ ষাট পঁয়ষট্টি বছরে সে কেন বাসে বই ফেরি করে বেড়ায়। তার বর্তমান সংসার হয়তো সে আর স্ত্রীকে নিয়ে বা হয়তো সে একা। হয়তো কোন সময় সেখানে ছিল তার সন্তান সন্ততি, হয়তো এখন  নেই, হয়তো আছে বা থেকেও নেই, হয়তো আলাদা সংসার করে বাপ মায়ের সংসার থেকে সরে গেছে, সময় নেই এদের পেছনে সময় নষ্ট করার, হয়তো কালের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে, হয়তো উঠতি বয়স থেকে গাঁজা হিরোইন ধরে হয়ে গিয়েছে অসামাজিকতায় দীক্ষিত। কত কিছুই না হতে পারে। সম্ভাবনার শেষ নেই। তবে এই সন্তানসন্ততি এখন আর নেই এটাই এখন সত্য। থাকলেও এই ফেরিওয়ালার সংসারের আজ আর অংশ নয়। তাই খাদ্য পথ্য যোগার করার তাগিদে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলতে হচ্ছে তাকে। এটাই বাস্তবতা। আর হয়তো কোন দিনই জানা যাবে না তার প্রকৃত অবস্থাটা, হয়তো আমি বা আমরা ব্যথাতুর মনে তাকে কোন দিনই দিতে পারবো না সমবেদনা। সে হারিয়ে গেছে জনস্রোতে, এ সময়ের মাঝে, সমাজেরই অংশ হয়ে। 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s