মহাবিশ্ব নিয়ে ভাবনা চিন্তার শুরুটা যেভাবে

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সন্দীপন পাঠশালা’ উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একটি গল্প দিয়ে। গল্পটি হচ্ছে-

‘এক জ্যোতির্বিদ অন্ধকার রাত্রে আকাশের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে পথ চলতে গিয়ে একটা কুয়োর মধ্যে প’ড়ে গিয়েছিলো; তাকে এক ব্যক্তি উদ্ধার করেছিল, সে তাকে উদ্ধার করেই ক্ষান্ত হয় নাই, সঙ্গে একটি অমূল্য উপদেশও দিয়েছিল। বলেছিল, বাপু হে, মাটির খবর জান আগে, তারপর আকাশের দিকে তাকিও’

এটা একটা উপদেশ মূলক গল্প, ছোট্ট একটা উপদেশ বাণী আছে- আগে নিজ অবস্থার উপর সচেতন হও তারপর অন্য কিছু, আগে নয়।

তবে গল্পটি শুনিয়ে যে কেও বলতে পারে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি হবে। দৃষ্টি ধরণীতে রাখো। পেট চালানোর জন্য ধান্দাবাজি করে বেড়াও। ঘাড় উঁচু করে আকাশ দেখে ঘাড় ব্যথা বানানোয় কোন লাভ নেই।

তবে এমন কথা শুনলে যারা হালকা পাতলা বিজ্ঞানের বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস জানেন তারা চোখ পাকিয়ে তাকাবেন। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে বলতেও পারে; ঘাড় উঁচু করে উপরের দিকে না তাকালে মানুষ আর মানুষ হতো না, গরু ছাগল আর মহিষের মতো ঘাড় নিচু করে শুধু খাবারই খুঁজে বেড়াতো। আকাশই মানুষকে প্রথম মুক্ত ভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে কৌতূহলী হতে, শিখিয়েছে কৌতূহল নিবারণের জন্য প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মতো অনুসন্ধানী হওয়া। আর এই ঘাড় উঁচু করা-ই আদিম দুর্বল শক্তির মানুষকে করেছে বর্তমান পরাক্রমশালী মানুষে।

কথায় কথায় আরো অনেক কিছু শুনিয়ে দিতে পারে। আধাঘণ্টার একটা নাতিদীর্ঘ লেকচার দিয়ে দেওয়াও বিচিত্র নয়। আপাতত আমরা সে দিকে না গিয়ে আদিম মানুষের চিন্তা ভাবনার উত্তরণ কি ভাবে আকাশে করেছে সে দিকে একটু দৃষ্টি দেই।

এমন একটা সময়ের কথা কল্পনা করে নেয়া যাক যখন মানুষ সভ্য হয়ে উঠেনি। বনে বাদরে ঘুরে বেড়ায়। গাছে দালে ঝুলে ফল সংগ্রহ করে খায়। সুযোগ পেলেই দলবদ্ধ হয়ে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কোন প্রাণীকে আক্রমণ করে বসে। তারপর হত্যা করা সম্ভব হলে কেটে কুটে খেয়ে দেয়ে-ঘুম। 

খাদ্দানুসন্ধান আর শিকারের ব্যাপারে দিনকে দিন তারা হয়ে উঠছিল ধূর্ত, দিনে দিনে আরও হয়ে উঠছিল কৌশলী। এতে যেটা হওয়া যায় সেটাই হল, চতুর শিকারি প্রাণী। মানুষ নয়। তো আরেকটু খানি কল্পনা করে নিই আমারা এখন সে সময়ের কোন ছোট মানুষ না হয়ে উঠা মানুষের দলকে পর্যবেক্ষণ করছি। যারা দিবালোকে খাবার খুঁজে বেড়ায়। আর রাত নামলে হিংস্র নিশাচর প্রাণীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে কোন গুহায় বা গাছের দালে উঠে ঘুমিয়ে পারকরে দেয় রাত টুকু। নতুন আরেকটি দিনের আলোয় একটু ভালো খাবার প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। এরকম কোন রাত্রিতে কোন একজন হয়তো রাতের আকাশের দিকে ঝিমুতে ঝিমুতে তাকিয়েছে। দেখল শত সহস্র নক্ষত্র, সে তো জানে না নক্ষত্র কি তাই তার মনে হল অসংখ্য ছোট ছোট জ্বলন্ত লাল নীল সবুজ বাহারি রঙের আলোক বিন্দু। আগেও দেখেছে তবে এগুলো কিন্তু তাকে তেমন ভাবায়-নি। আজকে ভাবাচ্ছে। ঘুমে ঢুলুঢুলু  ভাবটা চলে গেছে। এগুলো সম্পর্কে বোধ করছে কৌতূহল। খাবার খোঁজার কৌতূহল নয়। নিছক জানার জন্যে এই কৌতূহল। তারপর দিনের পর দিন এ নিয়ে ভেবেছে, কত নির্ঘুম রাত্রি পার করেছে ভেবে ভেবে, কোন কোন সময় গুহা দেয়ালে ছবি এঁকেছে  নক্ষত্রলোকের মনের খেয়ালে, অনুসন্ধান করে জ্বলন্ত আলোক বিন্দুগুলোর ব্যাপারে। এই কৌতূহল ছড়িয়ে দিয়েছে তার গোত্রের অন্যদের মাঝে। অন্যরা ছড়িয়েছে আরও অন্যান্য গোত্রের মাঝে। হয়তো সঠিক কোন উত্তর বের করতে পারেনি সে। তবে এভাবেই খাদ্যানুসন্ধানের চিরায়ত প্রাণীজ চিন্তাধারা থেকে অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করতে শিখেছে এভাবেই। ফলশ্রুতিতে কালক্রমে- এখনকার সভ্য মানুষ। আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের শুরুটা হয়তো হয়েছিল ওরকম মহেন্দ্র কোন ক্ষণ থেকেই।     Image

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s