অলিখিত যুগের মানুষের প্রকৃতি পাঠ

আদিম মানুষ যখন মানুষ হচ্ছে তখন সমান্তরাল ভাবে অনেক গুলো ঘটনা ঘটছিল। যেমন গুহা ছেড়ে গ্রাম বা শহর বা ওরকম কিছু গড়ে তোলা। চাষাবাদের কৌশল আয়ত্ত করে আর পশু পালন করে খাদ্য সংস্থানের জন্য শুধু মাত্র প্রকৃতির উপর নির্ভরশীলতা থেকে বেড়িয়ে আসা। নিজে বা নিজেদের গোত্র-দলের স্ব-নির্ভরশীলতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। এরকম বহু কিছু। তবে এগুলোর সাথে প্রকৃতিকে বুঝার বিষয়টিও ছিল। প্রতিনিয়ত তারা বুঝার চেষ্টা করতো প্রকৃতিকে। সবসময় নিছক কৌতূহলের বশে বুঝতে চাইত বললে ভুল হবে। নিজেদের জীবনের তাগিদেই প্রকৃতিকে চেনা ছিল তাদের জন্য আবশ্যক। ঋতু পরিবর্তন তাদের প্রকৃতিকে বুঝার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশে ছিল। কারণ কোন ঋতুতে কোন ফসল হয়, পাওয়া যায় কোন ফল। কখন নদীর তীর অঞ্চল প্লাবিত থাকে, এসব তাদের বেচে থাকার তাগিদেই জানতে হতো। পুরুষানুক্রমে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা বুঝেছিল প্রকৃতির এসব পরিবর্তন গুলো যাদৃচ্ছিক ভাবে ঘটে না। পর্যায় ক্রমিক ভাবে ঘটে। যেমন যেমন সূর্য প্রতি দিনই উদয় হয় আবার অস্তমিতও হয়, নামে রাত। পর্যায়ক্রমে প্রতিনিয়ত এমনটাই ঘটে। পনেরো দিন অন্তর অন্তর হয় চাঁদের কলার চাক্রিক পরিবর্তন, আমাবস্যা-পূর্ণিমা, দিন পনেরো পর আবার আমাবস্যা। সূর্য আর চন্দ্রের এই ক্রম পরিবর্তন থেকেই কোন একসময় ঋতু পরিবর্তন আর সময়কাল নির্ধারণের একটি ক্রম বেড় করে ফেলল।
আবার আমারা কোন প্রাচীন গোষ্ঠীর কথা কল্পনা করে নেই। যারা একসময় খেয়াল করল মোটামুটি তিনশো পঁয়ষট্টি বার সূর্যের উদয় অস্ত ঠিক ঠিক একই ঋতুতে প্রত্যাবর্তন করে প্রকৃতি। ঠিক একই অবস্থানে চলে আসে সূর্য, যেমনটি ছিল তিনশো পঁয়ষট্টি দিন আগে। কারণ প্রতিদিনই সূর্য প্রতিবার পুবে উদিত আর পশ্চিমে অস্তমিত হয় আর এ ভ্রমণের ভ্রমণ পথের একটু একটু করে অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে প্রতিদিনই। তিনশো পঁয়ষট্টি দিনে চক্রে আবার চলে আসে পূর্বের অবস্থানে। এই সময়কাল কে তারা সংজ্ঞায়িত করে বছর বলে। এভাবে সৌর নির্ভর সময় নির্ধারণের শুরু হয়। যেটি এখন সর্বাধিক প্রচলিত সময় নির্ধারণ পদ্ধতি।
আবার, কোন কোন গোষ্ঠী সূর্যের পরিবর্তে চাঁদের কলা দিয়ে সময়ের হিসেব রাখা শুরু করেছিল। ত্রিশ দিন পর পর চাঁদে পূর্ণিমা হয় তেমনি হয় আমাবস্যা। এই ত্রিশ দিনের চক্রের প্রতি চক্রকে ধরা হতে লাগলো মাস হিসেবে। এ পদ্ধতি দিয়ে সময় সময়ের হিসেব রাখা সহজ। বলাও সহজ।
অতীতের কোন বাঘ শিকারের ঘটনা সেই প্রাক সভ্যতা আর সংখ্যা সম্পর্কে অজ্ঞতার যুগে দিনের হিসেব করে করে রাতের বেলা অলস ভাবে আগুনের পাশে কুণ্ডুলী পাকিয়ে বসে শিকারিরা ‘আশি চাঁদ’ আগের ঘটনা বলে স্মরণ করবে, এটা তাদের জন্যে সহজ, সূর্য নিয়মে ‘চব্বিশো দিন’ (তথা ‘সাড়ে ছয় বছর’) আগের হিসেবে নয় । বিষয়টি এরকম।
এখন আমারা যে সময়-পঞ্জিকা দিয়ে সময়ের হিসেব রাখি তা মূলত এই দুয়ের সংমিশ্রণে গড়া এক পঞ্জিকা। ত্রিশ দিনের মাস গুলোকে দু একদিন এদিক সেদিক করে এমন ভাবে বারোটি মসে বিভক্ত করা হয়েছে যেন বারো মাসে এক সৌর বছর হয়।
আমরা আবার প্রাচীন সমাজে ফিরে যাই। সে সময়কার কেও কেও লক্ষ করল সূর্য বা চাঁদ দিয়ে সময়ের হিসেব রাখা গেলও ঋতু পরিবর্তনের সময় নির্ধারণ করতে গেলে অনেক বেশি হিসেব নিকেশ করতে হয়। এ থেকে উত্তরণের জন্য তারা আকাশের দিকেই দৃষ্টি দিল। আরও সহজ কোন নির্দেশিকা পাবার আশায়। আকাশের পানে তাকানোটাই স্বাভাবিক ছিল কারণ চন্দ্র সূর্য যেহেতু আকাশে থেকে প্রকৃতির সময় ক্ষণ নির্ধারণ করে তাই আকাশের অন্যান্য জ্যোতিষ্কদেরও কিছু না কিছু নির্দেশিকা থাকবে, তাদের পক্ষে সেটাই ভাবাই ছিল সঙ্গত।
এখানে একটি মজার জিনিস পাওয়া গেল। তারা দেখল সূর্য চন্দ্রর মতো নক্ষত্ররা উদিত হয় আবার অস্ত যায়, পর্যায়ক্রমিক ভাবে। কিন্তু কয়েকটি আকাশী বস্তু ঠিক ঠিক সরল ক্রম অনুসরণ করে না। তাদের অবস্থান আর গতিবিধি কিছুটা বিক্ষিপ্ত(এখন আমারা জানি এগুলো আমাদের সৌরজগতের গ্রহ)। তার উপর এগুলো সহ কিছু নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা অন্যান্য বিন্দুবৎ জ্যোতিষ্কদের চাইতে বেশি, এই অতি উজ্জ্বলতম বিশেষ কয়েকটি জ্যোতিষ্কের উপর অধিক মনযোগী করে তৈরি হয়েছিল, আর সেটাই স্বাভাবিক। ঋতু পরিবর্তনের সময় নির্ধারণ করতে গিয়ে এদের গতিবিধির সাথে ক্ষণকাল মেলানো শুরু করল। অতঃপর এদের দিয়েই ঋতুর পরিবর্তন গুলো নির্ধারণ করা শুরু হল। যেমন বর্ষায় প্লাবনের আগমনী সময় নির্ধারণ করা হতো মিসরের নদী পাশের প্লাবন অঞ্চলে যখন সূর্য অস্তর পরপরই পূর্ব দিগন্তে লুব্ধক নামক নক্ষত্রটি দেখা দিত। এই ভারতীয় উপমহাদেশে যখন যখন পূর্বাকাশে রাত নামার পরপরই উজ্জ্বল এক জ্যোতিষ্ককে(বৃহস্পতি গ্রহ)মধ্য গগন মুখী হতে দেখা যায় তখন এ দেখেই বলে দেয়া যায় শিত আসছে। যখন শীতকাল প্রায় শেষের দিকে ততদিনে এর অবস্থান সূর্যাস্তের পর এমন হয় যে এটা ঠিক পশ্চিমাকাশে দেখা যায়, মানে শীত চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে । তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল এমনটাই, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সময় নির্ধারণ করা। যতটা না ছিল বিশ্ব প্রকৃতিকে বুঝা।
সে সময়ের মানুষদের আকাশ পর্যবেক্ষণ, সর্বোপরি প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা ছিল অনেকটা-পর্যবেক্ষণ অতঃপর বর্ণনা করা। তাই তাদের মধ্যে খুব সহজেই বদ্ধমূল ধারণা হল জ্যোতিষ্কদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্যই প্রকৃতির এই পরিবর্তন। তথা ঋতুর পরিবর্তন। যদিও এটি নিছক এক কন্সিকুয়েন্স ছাড়া কিছুই নয়। আস্তে আস্তে বংশানুক্রমে এই অতি লৌকিক ঘটনা গুলোকে তাদের কাছে হয়ে উঠল অলৌকিক। বাস্তব পর্যবেক্ষণ আর কল্পলোকের মিশেলে তারা ভাবতে শুরু করল জগত বিশ্ব সংসার অদৃশ্য শক্তিদের খেয়াল খুশি মতো হচ্ছে। জল্পনা কল্পনার মিশেলে এই অদৃশ্য শক্তি গুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য দেব দেবী অসুরের অভ্যুদয় হল যাদের বিচরণ আকাশ পটে। বেশি ভালো হয় যদি বলা হয় মনস পটে। যারা নিয়ন্ত্রণ করে আকাশ অন্য ভাবে সমগ্র জগত সংসারকে। এমন কি তাদের ব্যক্তি গত জীবনকেও। এভাবে নিজেদের কল্পনার গণ্ডীতে বন্দী হল নিজেরাই। ধর্মর উৎপত্তি হয়তো এভাবেই হয়েছে তখনকার কোন এক সময়ে।
এ সময় গুলোতেই অনেকে কল্পনা প্রবণ শৈল্পিক মনে আকাশের জ্যোতিষ্কদের দিয়ে আঁকতে শুরু করেছিল ছবি-তারাচিত্র। যাদের একেকটি হচ্ছে একেকটি তারা মণ্ডল। অলস দুপুরে আমরা আকাশে ছুটে চলা মেঘদের দিকে যেমনি তাকিয়ে কল্পনায় গরু ঘোড়ার ছবি আঁকি ওগুলো ছিল তেমনি কল্পনার ছবি। একেক অঞ্চলের মানুষ একেক রকমের ছবি আঁকত। মেষ, বৃশ্চিক, হুতুম পেঁচা থেকে রাজকন্যা কি-নেই সেখানে। লোকজ গল্প গাঁথার সাথে এদের মিলিয়ে দেয়া হতে লাগলো। সহস্র বছরের প্রচলিত কতশত গল্প যে আছে তার কোন ফিরিস্তি নেই।
কোন একসময় এভাবে জন্ম মৃত্যুর ব্যাপার গুলোও মিশিয়ে ফেললো আকাশের সাথে। ধরে নিলো মৃত্যুর পরে বাসিন্দা হওয়া যায় স্বর্গের। পুণ্যবানরা যায় সেখানে। স্বর্গ হচ্ছে উপরের আকাশটা। রাতের আধারে মর্ত্য দেখতে মৃত পূর্ব পুরুষরা আসে বার বার। নক্ষত্র বা জ্যোতিষ্ক হয়ে। স্বর্গে থেকেও মর্তের মায়া কাঁটাতে পারে না হয়তো। দেব দেবতারা উজ্জ্বল আকাশী জ্যোতিষ্ক হয়ে, অন্যরা গুড়িগুড়ি জ্যোতিষ্ক হয়ে বিচরণ করে আকাশে।
উল্কা পাতকে ধরে নেয় নক্ষত্রদের পতন। কোন স্বর্গীয় কিছুর মর্তে অবতরণ। নতুন পথের দিশারী নয়তো ধ্বংস করতে শত্রুদের, যাদের উপরে রয়েছে স্বর্গীয়দের বিতৃষ্ণা। বেজে উঠে শান্তি সুর নয়তো যুদ্ধের দামামা। ভূমির নীচকে ধরে নেয় নরক। যেখানে জ্বলন্ত অগ্নি সবসময়ের জন্য প্রজ্বলিত। লাভার ঊদ্গিরণ দেখে হয়তো এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। স্বভাব চরিত্র খারাপ বা অন্যায় অবিচারকারী হলে এই নরক বাসী হতে হবে অনন্ত কালের জন্য, মৃত্যুর পর।
এ হচ্ছে অলিখিত সময়ের কথাবার্তা- চিন্তা ভাবনা। যখন মানুষ গড়ে তোলেনি কোন সমাজ সভ্যতা। লিখিত তেমন কোন প্রমাণ না থাকায় সে সময়ের চিন্তা ভাবনা গুলো নিয়ে চিন্তা করতে আমাদের অনেকবারই হয়তো হয়তো বলে সম্ভাবনাময় কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে, কারণ একটাই লিখিত বা সরাসরি কোন সাক্ষ্য প্রমাণ যে নেই। যা আছে তা সব ছোটখাটো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যেমন স্টোন হেঞ্জ বা গুহার দেয়ালে আঁকা ছবি বা ওরকম কিছু। যাদের তৈরির পেছনে দেখতে পাওয়া যায় আকাশী বস্তুদের বিভিন্ন অবস্থানের প্রভাব, নকশায়, গঠনে পরিপুষ্ট এরা সব তাদের ওই সব চিন্তাভাবনার মৌন সাক্ষী।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s