‘এশিয়ার নক্ষত্ররাজি’ গ্রন্থের তিনটি গল্পের অনুবাদ ১

trans1

‘এশিয়ার নক্ষত্ররাজি’ (Stars of Asia) বইয়ের জন্য তিনটি গল্প অনুবাদের দায়িত্ব কাঁধে চেপেছিল। চীনা গল্প একটা আর কোরিয়ান দুইটা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আর পায়ের ধুলা ধুয়ে মুছে কষ্ট টষ্ট করে অনুবাদ করেছিলাম। বই আকারে প্রকাশের অবস্থা কতদূর জানি না। তবে অনুবাদ গুলো পোস্ট করে রাখা উচিৎ মনে হচ্ছে। যদিও এই অনুবাদে নিজেই সন্তুষ্ট নই, অন্তত এগুলো আমার  প্রথম অনুবাদ তো তাই মাথা ঘামাচ্ছি না।

এক রাখাল আর এক তাঁতির গল্প। -চীন

প্রতি বছর  চীনা কেলেন্ডারে সপ্তম মাসের সপ্তম দিনে হয় কুইজি উৎসব (Qixi festival)। একে চীনা ভ্যালেন্টাইন ডে বলা যেতে পারে। তবে চৈনিক নাম অনুযায়ী এর নাম ‘নৈপুণ্যের রাত্রি’(night of skills) বলা হয়।  এ উৎসব প্রতিনিধিত্ব করে প্রাচীন জনপ্রিয় এক রোমান্টিক গল্পকে।  সেটি হচ্ছে এক রাখাল আরেক তাঁতি মেয়ের প্রণয় কাহিনী।

লিখিত রেকর্ড অনুসারে গল্পটি প্রথম লিখিত আকারে পাওয়া যায় ঝোও রাজবংশর সময়কার ক্লাসিক গ্রন্থ ‘গানের বই’য়ে (Book of Songs)। তাও সেটা আবার এক হাজার খ্রিস্টীয় পূর্বাব্দের একটা গ্রন্থ। সে হিসেবে বিগত তিন হাজার বছর ধরে গল্পটি উপাখ্যান থেকে কিংবদন্তীতে রূপান্তরিত হয়েছে। মিশে গিয়েছে আঞ্চলিক গাল-গল্পের সাথে। চীন আর এর আশে পাশের অঞ্চলে অন্তত শ’ খানেক আঞ্চলিক গল্পে এটি মিলে মিশে রয়েছে।

জাপান ভিয়েতনাম আর করিয়ো অঞ্চলেও এধরেন উৎসব হয়ে থাকে।

*       *        *        *        *

আকাশের এক নক্ষত্র হচ্ছে দেবী ঝিনু (Zhinu; Vega) আর এক নক্ষত্র দেবতা নিউলেঙ (Niulang; Altair)।  তারা একে অপরকে একে অপরকে ভালোবাসতো কিন্তু আকাশী আইনে(Celestial rules) সেটা অনুমোদিত ছিল না। ঝিনু ছিল আরেক দেবী জিওয়াংমু’র() বড় মেয়ে। জিওয়াংমু তার মেয়ের এই অনুমোদন হীন প্রেমের জন্য শাস্তি স্বরূপ মেঘ দিয়ে বুনন কাজ করতে দিল আর নিউলেঙকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলো। ঝিনুর সেই মেঘের বুনন হচ্ছে আকাশের চাঁদোয়া। আর একেক রঙের চাঁদোয়া হচ্ছে একেকটি ঋতু। সে যা হোক, নিউলেঙ ছাড়া ঝিনু প্রায়ই কাঁদত আর তা বৃষ্টি হয়ে ঝরতও। আরেকটা কাজ সে করত তা হচ্ছে মনে মনে প্রতিনিয়ত নিউলেঙের স্বর্গে ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা।

একদিন, ঝিনু তার মা  জিওয়াংমুকে অনেক বলে কয়ে পৃথিবীতে যাওয়ার অনুমতি নিলো। রওনা দিলো পৃথিবীর উদ্দেশ্যে। ওদিকে নিউলেঙ পৃথিবীতে এসে জন্মগ্রহণ করল অতিসাধারণ এক কৃষক পরিবারে। এক সময় তার কৃষক পিতামাতা লোকান্তরিত হল। নিউলেঙের ছিল এক ভাই সে নিউলেঙকে তেমন পছন্দ করত না। উপরন্তু নিউলেঙকে একদিন এক বুড়ো ষাঁড় দিয়ে বাড়ি থেকে একরকম তারিয়ে দিয়ে নিজের মত করে চলতে বলল।

ওই ষাঁড়টি কিন্তু ছিল আরেকটি দেবতা। সে এসেছিল ষাঁড় নক্ষত্র থেকে। নিউলেঙ আর ষাঁড়ের ছন্নছাড়া চলার পথে ষাঁড় দেবতা পরামর্শ দিলো সে কোন দেবীকে গোসল করতে দেখলে সে যেন দেবীর লাল রঙের কাপড় খানা সরিয়ে ফেলে। তাইলে দেবী নিউলেঙকে বিয়ে করবে। নিউলেঙ একসময় একটি পুকুরে অচেনা দেবীকে গোসল করতে নামতে দেখল ষাঁড়ের কথা মতো সে তার লাল রঙের কাপড় সরিয়ে নিলো। সে দেবীই কিন্তু ঝিনু। আর ঝিনু কিন্তু জানতো এই কাপড় সরানো মানবটি হচ্ছে স্বর্গের সেই নিউলেঙ। এবার ষাঁড়ের  মধ্যস্থতায়  তাদের বিয়ে হল। শুরু হোল এই নব দম্পতির সুখের সংসার। ঘর আলো করে জন্মো নিল ফুটফুটে একটি ছেলে আরেকটি মেয়ে।  কিন্তু এরই মধ্যে জিওয়াংমু ফেলল এদের পার্থিব অবস্থার কথা। রাগান্বিত হয়ে মেয়েকে ফেরত নেয়ার জন্য তার অনুগত প্রহরীদের পাঠাল পৃথিবীতে। তারা গোপনে ঝিনুকে তুলে নিয়ে গেলো তার মার কাছে।

ঝিনুকে হারিয়ে  দিশেহারা নিউলেঙ তাদের দুই সন্তান কাঁধে লাঠিতে বাঁধা ঝুরিতে করে নিয়ে উরে চলল আকাশ পানে।  আর জিওয়াংমু। সে তার চুলের পিন দিয়ে আকাশের গায়ে আঁচর কেটে কেটে প্রশস্ত নদী বানিয়ে ফেলল। এই নদী দিয়েই ঝিনুকে  নিউলেঙ ও তার দুই সন্তান থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। এদের অবস্থান হয় নদীর দুই তীরে। এই নদীটি হচ্ছে এখনকার আকাশ গঙ্গা অর্থাৎ milkyway আর চৈনিক নাম রূপালী নদ( silver river)।

গল্পের আরেকটু ছোট অংশ আছে, জিওয়াংমু পরে দয়া দেখিয়ে বছরের একদিন তাদের কাছাকাছি আসার অনুমতি দেয়। সেটিই হচ্ছে বছরের সপ্তম মাসের সপ্তম দিবসের রজনী। কথিত আছে এই সময় ম্যাগপাই’রা পৃথিবী থেকে স্বর্গের দিকে গিয়ে রূপালী নদী সেতু বন্ধন তৈরি করে প্রেমিক যুগল আর তাদের দুই সন্তানের জন্য।

*এই দিনে চীনে ঝিনুর (ভেগা) কাছে মেয়েরা আর  নিউলেঙ (অলটির) কাছে মেয়েরা আর ছেলেরা চায় বা অন্য অর্থে প্রার্থনা করে একজন বুনন কাজের নিপুণতা আর অন্যজন ভালো রাখালের নিপুণতার জন্য।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s