চারপাশে দেখা

||রাস্তায় রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা স্বভাবের জন্য অনেক সময় অনেক ধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। হঠাৎ মনে হল দু একটার কথা লিখে টিখে রাখলে মন্দ হয় না। সেই ইচ্ছা থেকেই এই লেখার প্রচেষ্টা। ||

আমার চালচলনে একটু উরা-ধুরা ভাব আছে। কখন কি করি ঠিক ঠিকানা নেই। টাইম মেনে চলা বলতে যে কাজ গুলো করি তার একটা হচ্ছে কাজ না থাকলে ভরদুপুরে চাঁদি ফাটা রোদের নিচে হাটতে বেরুনো। এই সময়ে বেছে নেয়ার প্রধান কারণ রাস্তা ঘাটে লোকজন কম থাকে। নিজের মনের মতো ঘুরাঘুরি করা যায়। স্ট্রিট ফটোগ্রাফি নামক একটা ব্যাপার আছে সেটাও আরাম’সে করা যায়। স্বাভাবিক ছবি তুলা সহজ হয়। হাতের ক্যামেরার দিকে লোকজনের মনোযোগ থাকে কম। কাজকর্ম আর খাওয়ার চিন্তাই মনে হয় তখন সবার মনে বেশি ঘুরপাক খায়। মেয়েদের সংখ্যাও থাকে কম। এইটা আরেকটা বড় উছিলা। ক্যামেরা দিয়া মানুষজনের ছবি তুলচ্ছি, অন্যদিকে কোন মেয়ে যদি SOMEHOW চিল্লান দিয়ে বলে, ‘ওই ব্যাটা আমার ছবি তুলতাছস ক্যা?’ তাহলে তো আমি শেষ। মাইর কতটুকু খাবো জানি না। তবে ‘কাছাড় মাইরা দৌড় দেয়া’ বলতে যা বুঝায় সেটা যে দিতে হবে সন্দেহ নাই। এ শুনে দয়া করে ভেবে না বসলেই হল আমি লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের ছবি তুলতে বের হই। আরও সুবিধা আছে, হুট হাট করে পরিচিত লোকজন ধরে খাজুরে গল্প করা শুরু করে না। এক্কেবারেই করে না সেটা বলছিনা, তবে বলার সম্ভাবনা কম থাকে। এই ‘সম্ভাবনা’ ব্যাপারটায় আমি ব্যাপক মনযোগী, মেনেও চলি সেই রকম। একদম সাই ফাইয়ের রোবটদের মতো কিছুটা কাঠখোট্টা ধাঁচের বলা চলে।

রুটিন মাফিক চলার আরেকটা জিনিস আছে! সন্ধ্যার পর বেশি আলসেমি না লাগলে আর বাঙ্গাল মুল্লুকের লোড সেডিং নামক যাবতীয় ‘বাত্তি নিভানোর যজ্ঞ’ সংগঠিত হলে বাচ্চা কালের স্কুলের মাঠের পাশের রাস্তা ধরে হাঁটাহাঁটি করা। আমার সমগ্র কুঁড়েমির মধ্যে একমাত্র ‘নন কুঁড়েমি বা আন কুঁড়েমি’ মার্কা কাহিনী হল এই দুপুর সন্ধ্যা দুবেলা রাস্তা ধরে চক্কর দেয়া। আজিব, এইসব কি লিখছি! এই আগডুম বাগডুম পড়ে যে কারো মাথায় এতক্ষণে চক্কর মারা শুরু হয়ে যেতে পারে, হয়েছেও নাকি সেটা উপর’আলা বা উপরের তলায় যারা থাকে তারা যতটুকু জানে লেখাটার দিকে ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে থাকা’আলারা আরও ভালো জানে। মূল কাহিনীতে যাই। যার জন্য আমার এই লিখালিখির পদক্ষেপ (ভালো হয় যদি বলি, কিবোর্ডোক্ষেপ)। যথারীতি আজকে সন্ধ্যার পর ‘বাত্তি নিভানোর যজ্ঞ’ শুরু হয়েছে। কি আর করা আমিও ঠাণ্ডার মধ্যে একখানা ঠাণ্ডা কোল্ড ড্রিংকস দোকান থেকে বাকি(!!) নিয়ে মাঠের পাশের রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। আসমানের দিকে তাকিয়ে একটু কালপুরুষ খুঁজলাম, পেলাম না। আকাশ ঘোলা। আমাকে দেখেই কিনা জানি না কুপ্পী জালিয়ে ভ্যানে যিনি বাদাম বিক্রি করছিলো তিনি প্রস্থান করলেন। এর সাথে ‘বাকি’ ব্যাপারটার কিন্তু সম্পর্ক নাই। বাকি যা খাওয়ার একটা বিশেষ দোকান থেকেই খাই, সেই ক্লাস থ্রি থেকে। অন্য কারো কাছ থেকে নয়। এ জন্য অত্র এলাকায় বিশেষ সুনাম আছে। এমনকি বন্ধুবান্ধব পোলাপানের কাছ থেকে ধারদেনাও করি না, EXCEPT বইয়ের দোকান আর বইমেলা। আমার সাথে সেখানে যে থাকবে তার খবর আছে।

আরে, কাহিনী বারবার অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে ক্যান? যা হোক আবার লাইনে আসি। একটু খেয়াল করে দেখলাম খানিক দূরে রাস্তা লাগোয়া মাঠের কাছেই তিনটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। বেশ খানিক দূরে একটা পেট্রোল পাম্প আছে, ওটার আলোয় ঝাপসা মতো দেখতে পাচ্ছিলাম এদের দু জন টুপি পরা, খানিকটা মৌলবি গোছের। তবে মাত্র কৈশোর পেরুনো তরুণ বলা যাতে পারে। সম্ভবত তিনজনেই মাগরিবের নামাজ পড়ে এসেছে। আলসেমি পেয়ে বসল, দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত। হঠাৎ মনে হল ওদের কথার মধ্যে অছিয়ত দেয়ার দেয়ার সময় যেমন হয় তেমনি খানিকটা গুরু গম্ভীর ভাব চলে এসেছে। এদিকে আমার কিছু করার নাই, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় দিনের ঠাণ্ডায় কোল্ড ড্রিংকস পান করতে করতে বেখেয়ালে একজনকে বলতে শুনতে শুনলাম, ‘জন্ম-নিবন্ধন ব্যাপারটা আমি ঠিক মানতে পারি না। এটা ইসলাম সম্মত কিনা জানি না তবে এর প্রয়োজন নাই, সেই দিন হুজুরে এই নিয়ে যুক্তি দেখাইসে’।
‘কি বলসেন?’ অন্যজনকে বলতে শুনলাম। এদিকে আমি টাস্কিময় চমকিত। এরা বলছে কি? ‘জন্ম নিবন্ধন’ নিয়া আবার হুজুরেরা মাথা ঘামাচ্ছে কেন। জন্মের দিন তারিখের সত্যায়িত ঠিক রাখার লিখিত একটা রূপ হচ্ছে জন্ম নিবন্ধন। এর মধ্যে ধর্মীয় সেন্স আনার দরকারটা কি হতে পারে। এবার কৌতূহল বসে খেয়াল করার চেষ্টা করলাম ওদের কথাবার্তা। খানিকেই বোধগম্য হল শব্দটা ‘জন্ম নিবন্ধন’ হবে না হবে ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’। জন্ম নিবন্ধন দিয়েই জন্মনিয়ন্ত্রণের কাজ চালাচ্ছে। তবে হুজুর যা বলছে সে মতে এ নব্য তরুণের কথা যেমন শুনলাম সেটা হচ্ছে, ‘আরে ভাই শুনো, এইসব আমাদের জন্য নয়। আমরা তো নবীজির উম্মত ঠিক কি না। পোলাপান কম হওয়া মানে বুঝো? মানে হল নতুন উম্মতের জন্ম কম হওয়া। এটা কি উচিৎ? আমাদের যত বেশি সন্তান হোক সমস্যা নাই। আমরা যে শিক্ষা পাইসি ওরা তো তাইই পাবে। সে জন্যে আমাদের পোলাপান তো আমাদের মতোই হবে,তাই না। আর অন্য বিধর্মীদের দেখো ওরা জানে ওদের পোলাপান যত কম হয় ততই ভালো। সন্ত্রাস জুলুম আর আজেবাজে কাজ তত কম হবে। তাই এইসব করে নিজেরা যেমন নিজেদের সংখ্যা কমাতে চায় আমাদেরও কমায়া দিতে চায়। বুঝসো কি রকম চাল চালে ওরা’।

অন্য দুইজনকে দেখে মনে হল খুব খুশি। একজন তো সন্তুষ্টির হাসি দিল মুখ চেপে। নাছারাদের নতুন একটা চক্রান্ত ধরতে পারায় এক্সপ্রেশনে আনন্দময় ভাব চলে এসেছে এদের মাঝে। এ দেখে শুনে কিন্তু আমার আক্কেল গুড়ুম(নাকি ধুরুম) করে বেআক্কেলে কনভার্ট হয়ে গেলো। কি করা উচিৎ সেটার কোন বোধোদয় হল না। এদের সাথে উল্টো যোগ দিয়ে আনন্দ উৎসব করবো কিনা তা নিয়ে কনফিউজড হয়ে গেলাম। আরও কিছু কথা হয়তো শুনতাম কিন্তু সবসময় যা হয়, আমার সেল ফোন প্যাঁ প্যাঁ শুরু করলো। ফোন কানে দিয়ে অন্যদিকে হাঁটা দিলাম।

এই লেখা পড়ার পর কেউ বিরক্ত হলে আমার কিছু করার নাই। সময় নষ্ট মনে করলেও কিছু করার নাই। তয় ঘটনা সত্য।

 

প্রথম প্রকাশ : আমার ব্লগ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s