টংয়ের দোকান আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কপোত কপোতী

অনেক দিন আগের কথা। আমি তখন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। বাচ্চা ছেলেই বলা চলে। সময়টা পার করেছি ভার্সিটিতে পড়া ভাইয়া আপুদের হাল চাল বুঝার চেষ্টায় রত হয়ে। রাস্তার ধারে টংয়ের দোকান গুলো ক্লাসের গ্যাপ টাইম পার করার জন্য তখন স্বর্গ তুল্য। দোকান গুলোতে মূলত চা, সিগারেট, ছোট ছোট বন রুটি আর কেক পাওয়া যায়। অতি কৃপণ স্বভাবের জন্য সে গুলো থেকে তেমন কিছু কিনে টিনে খাই না। ক্লাসমেটদের সাথে গল্প গুজব আর ভাইয়া আপুদের পরস্পরের দিকে অদ্ভুত চোখ চাওয়া চাওয়ি দেখা ছাড়া তেমন কিছু করেছি বলে মনে পড়ছে না। সে সব দেখে মাঝে মাঝে মনে হত আর কত একলা চলবো। সে জন্য কিছুটা হাইপাই যে করতাম না সেইটাও ঠিক না। অন্তত একটা গার্ল ফ্রেন্ড থাকলে বন্ধু মহলে যে ‘ভাব’ মারা যায় সেটা নিয়ে তেমন কিছু নাই বা বললাম। ছেলে মাত্রই বুঝা উচিৎ।

তো একদিনের ঘটনা। ক্লাস শেষ অথবা কোন ক্লাসের গ্যাপে ভার্সিটির বিল্ডিং থেকে বেড়িয়ে যথারীতি এক টংয়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। আমার দুটি ফ্রেন্ডও ছিল সাথে। কি কথা হচ্ছিলো আমাদের মধ্যে মনে নেই তবে দুইজনই ফটোকপি করতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো আরেকটি দোকানে। আমি সেই টং এর সামনেই দাঁড়িয়ে রইলাম। হয়তো চা গিলছিলাম। সেই জন্যই ওদের সাথে ফটোকপির দোকানের দিকে যাই নাই। আমার আবার গরম চা মুখে দিলেই জিহ্বা পুড়ে যায়। ব্যাপক সমস্যা। ফু দিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা করে খেতে হয়। যদিও চায়ের দাম আমি দেই নাই সেই বিষয়ে নিশ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সব চা সংক্রান্ত বিলের বেশির ভাগই পরিশোধ করিয়েছি আমার আমার বন্ধু বান্ধবদের দিয়ে। আফটার অল, কিপ্টা বলে কথা!

আকাশে মেঘ ছিল মনে হয়। যতদূর মনে পরে অন্ধকার অন্ধকার একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিলো হঠাৎ করে। কি মনে করে দোকানের এক সাইডে কোন ঘেঁসে দাঁড়ালাম। পাশে একটি পর্দা মতো ছিল। পর্দার ওপাশেই পরিচিত একটা কপোত কপোতীর জোড়া দাঁড়িয়ে। পর্দাটা এমন ভাবে টাঙ্গানো যে ওরা আমাকে দেখতে পাচ্ছে না সরাসরি। আমিও পারছি না। কিন্তু রাস্তা থেকে ওদের আর আমাকে সবাইকেই দেখা যাচ্ছে। তারপরেও যত টুকু দেখলাম, আমার সিনিয়র ভাইয়া আপু ওরা। যদিও চিনি না। যা হোক চা খাচ্ছি আপন মনে। ওদের দিকে মনোযোগ নেই। এমন সময় খেয়াল করলাম পাশে দাঁড়ানো জুটির আপুটা নিচু গলায় ধমকের মতো করে ফোঁস ফোঁস করে কথা বলছে। উনার কথার প্রাবল্যতা যতটা না ছিল তার চাইতে তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। দুই জনের কারোই আমার দিকে খেয়াল নাই। আলো আঁধারী আর পর্দার আড়াল থেকে যতটুকু শুনলাম আর দেখলাম সেটা বড়ই অদ্ভুত।

আপুটাকে বলতে শুনলাম, ‘তোমাকে না বলেছি একটা বাইক কিনতে’।

বেচারা ভাইয়া কাঁচুমাচু করে বলল, ‘আব্বু দিবে না’।

‘কেন দিবে না’। আপু বেচারি যেন চোখে অন্ধকার দেখছে রেগে গিয়ে।

‘জানি না’।

‘জানো না মানে?’

‘কিভাবে বলবো। আমাকে পরিষ্কার করে বলেনি। বলেছে টাকা নেই এখন কিনে দেওয়া যাবে না’। ভয় পাওয়া গলায় উত্তর দিল বড় ভাইয়া।

‘ইয়ার্কি নাকি! তোমার বাবা টাকা খরচ করে তোমাকে ভার্সিটিতে পড়াতে পারে আর একটা বাইক কিনতে দিতে পারে না’। কথায় যেন সিনিয়র কপোতী আপুর নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। এদিকে বেচারা ভাইয়া মানুষ। কিছু বলতে পারছে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। অতঃপর মুখ বাতাসে কিভাবে যেন একটা ঝামটা মেরে আপুটার প্রস্থান। বেচারা বয় ফ্রেন্ডের সেইভাবেই ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা।

ইহা দেখে আর শুনে আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়! তবে ‘সিদ্ধান্ত’ has been taken, আমার গার্ল ফ্রেন্ডের দরকার নাই। আমারে পাগলে পাইসে। আমি ঘোড়া হব। আমারে চরাইয়া বেড়াবে আরেকজন। পারলে চোদ্দ গুষ্ঠি চায়ে টোস্ট বিস্কিটের মতো ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাবে। না বাবা আমার দরকার নাই। এমনিতেই সেই রকম আছি।

প্রথম প্রকাশ : আমারব্লগ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s