আহনাফের শর্ট ফিল্মের স্বপ্ন

আহনাফের সাথে দেখা হতো ফার্মগেটের এক চায়ের টং দোকানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। উষ্কখুষ্ক চুল। হাতে চায়ের কাপ। জীর্ণ ঢিলে ঢালা শার্ট প্যান্ট।পায়ে চপ্পল ধরণের প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। পায়ের উপরে পা তুলে বসে থাকতো। গরম চায়ে ফু দিয়ে ঠান্ডা করার সময় পা নাচাতো। কথা বলার সময়েও তাই করতো। সিগারেট খেতো। আমাকে দেখলেই তা ফেলে দিতো। চিরাচরিত বাঙ্গালী স্বভাবে বড়দের সম্মান প্রদর্শন।

 

ওর চোখে আমি দেখতাম স্বপ্ন। কন্ঠে শুনতাম স্বপ্নের কথা।

ও চেয়েছিল শর্ট ফিল্ম বানাতে। একেক দিন একেক প্লটে বানাতে চাইতো। বিষয় বস্তুর অভাব ছিল না তার। আমার কাছে চমকপ্রদ মনে হতো ওর ব্যাক্তি কেন্দ্রিক আইডিয়া গুলো।

 

যেমন ও শর্ট ফিল্ম বানাতে চেয়েছিল একজন ছিঁচকে চোরকে নিয়ে। দেখাতে চেয়েছিল ছিঁচকে চোরের দুর্বিষহ দিন, বেঁচে থাকা আর চিন্তাভাবনা গুলো।

 

চেয়েছিল তার পরিচিত কাওয়ান বাজারের ফুটপাতের কোন এক ফেন্সিডিলে আসক্ত, নেশাগ্রস্থকে নিয়ে শর্ট ফিল্ম বানাতে। বলেছিল ওই আসক্ত ব্যাক্তিটির উপরে অনেক তথ্য সে টুকে রাখছে। ফিল্ম বানানোর সময় কাজে দিবে।

 

চেয়েছিল বিকৃত রুচির একজন মানুষের উপরে শর্ট ফিল্ম বানাতে। যে জৈবিক তাড়নায় পাবলিক প্লেসে ভীড় বা ধাক্কাধাক্কির সময় বিপরীত লিঙ্গর মানুষের দিকে হাত বাড়িয়ে অসুস্থ কোন তৃপ্তি পেতে চাইতো।

 

চেয়েছিল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একজনের উপরে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ফিল্ম বানানোর। জনগণের প্রয়োজনে তার নির্লিপ্ততা বজায় রেখে সর্বত্র টাকার জন্য কিভাবে কামড়াকামড়ি করে তা নিয়ে।

চেয়েছিল ধর্মীয় উন্মাদনায় অস্থির কোন মৌলবাদের উপরে কাজ করতে। তার চিন্তা চেতনা, দৃষ্টি ভঙ্গী, বিবেক, দর্শন যেখানে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে।

 

আহনাফের শর্ট ফিল্মের গল্পে থাকতো কখনও নারী। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী। যার নিজেকে প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করতে হয় সমাজের অবহেলা, চোখ রাঙ্গানো আর সহস্র পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির মধ্যে থেকে।

 

আহা, সে যে কত গল্প, কতো প্লট, কতো পরিকল্পনা, শেষ হতো না একবার বলা শুরু করলে।

তারপর টং এর দোকানে আহনাফের সাথে দেখা হয় না। অনেক দিন দেখা হয় না। এক মাস, দুই মাস, তিন মাস কিংবা বছর-এক বছর, দুই বছর। হিসেব নেই।

 

মাঝে সেই দিন বনানী কাকলী মোড়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার সময় পেছন থেকে কেউ চিৎকার করে ডাক দিচ্ছে, ‘বড় ভাই’। পরিচিত কন্ঠ, তাকিয়ে দেখি আহনাফ। প্রথমে চিনতে পারিনি। ঝকঝকে শার্ট প্যান্ট। অফিসিয়াল আউটফিট। চুলে মুখের উষ্কখুষ্ক ভাব সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তার বদলে জেল দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো, চাকচিক্যময়।

 

বাসে না উঠে আমরা অভিজাত ফাস্টফুডের দোকানে গিয়ে শর্মা খেলাম। আর আহনাফ বলল তার হুট করে ফার্মগেট ছেড়ে নিরুদ্দেশ হবার কথা। বলল তার প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছিল। বাসার প্রেসার। তাই কোন মতো এক চাকরি জুটিয়ে মেয়েকে নিয়ে পালানো। চাকরিতে দুই তিনটা দ্রুত প্রমোশনে ভালো অবস্থায় এখন। প্রথমে মন কষাকষি চললেও মেয়ের আর ছেলের দুই পক্ষেরই বাসাতেই এতোদিনে মিটমাটও হয়ে গিয়েছে। সে তার বউ সংসার নিয়ে ভালো আছে। একটি সফল প্রেমের গল্প শুনলাম। কাজের চাপ ও প্রমোশনের জন্য ওর ছুটে চলার গল্প শুনলাম। শুনলাম ওর অফিসের কর্মকর্তা আর কলিগদের গল্প। সুখি সুন্দর গল্প।

 

তারপর মেসে ফেরার পথে মনে হল আহনাফ তো আজ কোন শর্ট ফিল্মের গল্প করলো না। কোন নতুন চমকপ্রদ প্লট নিয়ে কিছু বলল না। কোন স্বপ্নর কথা শুনালো না, ফিল্ম এর পরিকল্পনা জানালো না।

আপন মনে হাসলাম। শর্ট ফিল্মের স্বপ্ন গুলো ঢাকা পরেছে চাকরি বাকরি আর প্রমোশনের চাহিদার তলায়। ফিকে হতে হতে বিলীন হয়েছে হয়তো। আচ্ছা, আহনাফের উপরে কি কোন শর্ট ফিল্ম বানানো যায়? যেখানে থাকবে একজন স্বপ্নবিলাসী তরুণের স্বপ্ন গুলো চাপা পড়ার কথা অথবা নিজের ব্যক্তি স্বপ্ন গুলো হারিয়ে ফেলার কথা সমাজে মূল স্রোতে টিকে থাকার স্বপ্ন গুলোর মাঝে !

ধ্যাত। কি সব আবোল তাবোল ভাবছি। আমিও কি স্বপ্ন দেখছি সেই টং এর দোকানের সেই উষ্কখুষ্ক আহনাফের মতো করে, যে তার স্বপ্ন নিয়ে হারিয়ে গিয়েছে। জানি না।

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s